বাংলাদেশের অন্যতম প্রবীণ সাংবাদিক

-এর স্মরণে

এইচ এম জালাল আহমেদ

নির্ভীক সাংবাদিকতার প্রতিচ্ছবি

বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতে কিছু ব্যক্তিত্ব তাদের কর্মগুণ, সততা ও দায়বদ্ধতার মাধ্যমে অনন্ত শ্রদ্ধায় স্মরণীয় হয়ে থাকেন। এইচ এম জালাল আহমেদ ছিলেন তেমনই একজন। তাঁর সাংবাদিকতা ছিল কেবল পেশা নয়, এক দায়বদ্ধতা, এক সমাজসচেতন মননের প্রকাশ। নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে যাওয়া এই মানুষের জীবন ছিল দেশ, জনগণ ও সত্যের প্রতি অকুণ্ঠ ভালোবাসার প্রতিফলন।

তিনি বরগুনা জেলার পাথরঘাটা উপজেলার কাকচিড়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঐতিহ্যবাহী পল্লীজীবনের পরিবেশে। প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের পর তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় আগমন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি লেখালেখি ও সমাজসংলগ্ন কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন, যা পরবর্তীতে তিনি সাংবাদিকতাই পেশা হিসেবে বেছে নেন।

তাঁর পেশাগত জীবনে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিশেষ প্রতিনিধি, উপসম্পাদক ও সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বিভিন্ন নামকরা জাতীয় পত্রিকায়। সংবাদের নির্ভরযোগ্যতা, বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গি ও লেখার মৌলিকতার জন্য খুব অল্প সময়েই তিনি সহকর্মীদের মধ্যে বিশেষ মর্যাদা অর্জন করেন।

তিনি একাধারে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং মানবিক বিষয়বস্তুকে তাঁর লেখার মাধ্যমে গভীরভাবে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর কলম ছিল তথ্যনিষ্ঠ এবং দায়িত্বপূর্ণ। তিনি কখনোই বস্তুনিষ্ঠতা ও নিরপেক্ষতা থেকে বিচ্যুত হননি।

জাতীয় প্রেস ক্লাবের একজন স্থায়ী সদস্য হিসেবে তিনি শুধু সাংবাদিকদের কল্যাণে কাজ করেননি, বরং সংগঠনের আদর্শিক ভিত্তি শক্তিশালী করতেও নিরবিচারে ভূমিকা রাখেন।

১৩ মার্চ ২০২২ সালে, ঢাকার উত্তরায় নিজ বাসভবনে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন, তবুও জীবনশেষ অবধি পেশাগত দায়িত্বে ছিলেন নিবেদিত।

তাঁর মৃত্যুতে গোটা সাংবাদিক সমাজে শোকের ছায়া নেমে আসে। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এক যুক্ত বিবৃতিতে তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেন এবং তাঁর পরিবারকে সমবেদনা জানান।

উত্তরায় তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয় স্থানীয়ভাবে। এরপর জাতীয় প্রেস ক্লাব প্রাঙ্গণে দ্বিতীয় জানাজা সম্পন্ন হয় সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের অংশগ্রহণে। পরে মরদেহ তাঁর পৈতৃক নিবাস কাকচিড়া গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে গ্রামবাসীর অংশগ্রহণে তৃতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

২০২২ সালে জাতীয় প্রেস ক্লাব তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি স্মরণসভা আয়োজন করে। ওই সভায় বিশিষ্ট সাংবাদিক, লেখক ও সহকর্মীরা তাঁর পেশাগত জীবন, নীতিনিষ্ঠতা এবং সমাজ সচেতনতামূলক অবদান তুলে ধরেন। এইচ এম জালাল আহমেদ ছিলেন এমন একজন ব্যক্তি, যাঁর মত সাংবাদিকরা আজকের গণতান্ত্রিক সমাজে সত্যের পক্ষে অবিচল কণ্ঠস্বর।

তাঁর মৃত্যুর পর, তাঁর পুত্র মোঃ রাহাত ইসলাম পিতার পেশাগত দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। পিতার আদর্শ ও মূল্যবোধ অনুসরণ করে তিনি সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত হয়ে একটি গর্বিত উত্তরাধিকার রক্ষা করছেন।

এইচ এম জালাল আহমেদ ছিলেন সততা, আদর্শ ও মানবিকতা দিয়ে নির্মিত এক সাংবাদিকের নাম। তাঁর জীবন ছিল সংবাদপত্র জগতের জন্য এক অনুপ্রেরণা। তিনি যেমন লিখেছেন, তেমনি বেঁচে থেকেছেন—নিরপেক্ষ, সাহসী এবং অগ্রসর চিন্তায় উদ্বুদ্ধ হয়ে। আজ তিনি নেই, কিন্তু তাঁর আদর্শ ও কীর্তি বাংলা সাংবাদিকতার ইতিহাসে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।

“সত্যের পক্ষে কলম যার শাণিত ছিল, ইতিহাস তাকে বিস্মৃত করতে পারে না।”
— এইচ এম জালাল আহমেদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।